বাংলাদেশ-ভারত ট্রানজিট চুক্তি, সমতা ফেরানো জরুরি

বাংলাদেশ-ভারত ট্রানজিট চুক্তির নীতিগত অসমতা এখন স্পষ্ট। ভারত ইচ্ছে করলে ট্রানজিট সুবিধা হঠাৎ বন্ধ করতে পারে। নিজেদের দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর অগ্রাধিকার দেয়ার সুবিধা সংরক্ষণ করে। কিন্তু বাংলাদেশকে শুধু চুক্তির শর্ত মেনে চলতে হয়।

চলতি বছরের এপ্রিলে ভারত বাংলাদেশের জন্য ট্রানজিট সুবিধা হঠাৎ বন্ধ করে দেয়। এতে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি ব্যাহত হচ্ছে। রফতানির খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ, ক্ষেত্রবিশেষে ছয়গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে রফতানিমুখী ছোট ও মাঝারি শিল্প হুমকিতে পড়েছে।

সম্প্রতি এক গবেষণায় বাংলাদেশ-ভারত ট্রানজিট চুক্তির বৈষম্যের বিষয়টি নতুন করে উঠে এসেছে। গবেষণায় ওইসব চুক্তি পুনর্বিবেচনা ও সমানাধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্সের (ডায়রা) গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, মূল ট্রানজিট সুবিধা ছিল, ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে তৃতীয় দেশের জন্য মালামাল রফতানি করা। বাংলাদেশের আশা ছিল- তৃতীয় দেশে দ্রুত, সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পাঠানো এবং আংশিকভাবে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। কিন্তু বাস্তবে শুধু ট্রানজিটে ভারত লাভবান হয়েছে। আর বাংলাদেশী রফতানিকারকরা এখন ব্যয়বৃদ্ধি ও বিলম্ব মোকাবেলা করছেন। চুক্তিগুলোর পর্যালোচনায় ট্রানজিট এবং বাণিজ্য কমিশন গঠন এবং তাতে অর্থনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, পরিবেশ ও কূটনীতিবিদ বিশ্লেষক অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে, যাতে নতুন করে আলোচনা ও সমঝোতায় জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হয়।

ট্রানজিট নিয়ে বিগত আওয়ামী সরকারের নতজানু নীতি কারো অজানা নয়। এর যৌক্তিক মাশুল নির্ধারণেও ব্যর্থ হয় ফ্যাসিবাদী হাসিনার সরকার। এ ছাড়া চুক্তি অনুযায়ী ভারতের মাত্র ২২ কিলোমিটার ভূখণ্ড ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে পণ্য পরিবহনের সুবিধা ১৫ বছরেও আদায় করতে পারেনি। অথচ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে শত শত মাইল পেরিয়ে ভারত ঠিকই পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যে পণ্য সরবরাহ করেছে নামমাত্র শুল্কে।

পতিত সরকার ট্রানজিট বিষয়ে নিশ্চতভাবে আমাদের বড় একটি ক্ষতি করেছে। ২০১১ সালের শেষদিকে ট্রানজিট-সংক্রান্ত মূল কমিটির এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিট দিতে হলে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। তাতে ব্যয় হবে ৪৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে রেলপথে ২৯ হাজার ২২৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ দরকার হবে। পাশাপাশি ট্রানজিট-সংক্রান্ত অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়নের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে কমিটি। বলা হয়, বিনিয়োগের অর্থ বিদেশী সংস্থার কাছ থেকে নেয়া হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।

বাংলাদেশের সড়ক ও রেলপথ উন্নয়নে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার উচ্চ সুদের ঋণ দেয় ভারত, যা ব্যবহারে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেয়া ছিল বাধ্যবাধকতা। এর বাইরে চীনা ঋণে তিন থেকে চারগুণ বেশি ব্যয়ে যেসব সড়ক, সেতু, রেলপথ নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হয়েছে সেগুলোর মূলত লক্ষ্য যে ভারতের ট্রানজিট রুট সহজতর করা; তা দিন দিন স্পষ্ট হয়েছে।

আধুনিক বিশ্বে ট্রানজিট একটি স্বাভাবিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতার বিষয় হলেও জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে কোনো চুক্তি হতে পারে না। এ বিষয়ে আপসের সুযোগ নেই। এতদিন ট্রানজিট থেকে একতরফা সুবিধা পেয়েছে ভারত। এবার তাতে অন্তত সমতা ফেরানো জরুরি।

-নয়াদিগন্ত সম্পাদকীয়

Facebook
X
LinkedIn
WhatsApp
Telegram

আরও পড়ুন