হাজারো নদী বাংলাদেশকে জালের মতো ঘিরে রাখায় এ দেশকে নদীমাতৃক বলা হয়। শুধু নদী নয়, এ দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য হাওর, বাঁওড়, বিল-ঝিল, পুকুর ও জলাশয়। এসব জলাধার বর্ষা মৌসুমে পানিতে টইটুম্বুর হয়ে থাকে। তাই বর্ষায় গ্রামীণ জনপদে অনেক শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। তবে হাওরবেষ্টিত এলাকায় বর্ষাকালে বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। দেশের তেমন একটি জেলা নেত্রকোনা। জেলাটিতে সাম্প্রতিক সময়ে বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে।
বর্ষায় নেত্রকোনা জেলার ছয় উপজেলা পানিতে ডুবে থাকে। ফলে এসব উপজেলায় প্রায়ই পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু ঘটছে। এ জেলায় মাত্র চার বছরে চরে ৩০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একটি সহযোগী দৈনিকের নেত্রকোনা প্রতিনিধির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৫ নভেম্বর কেন্দুয়ার গণ্ডা ইউনিয়নের কানিয়ান গ্রামে পুকুরে ডুবে মারা যায় শাহদাত (৭) ও তাসফিয়া (৭)। ১১ নভেম্বর কান্দিউড়া ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামে ডুবে মৃত্যু হয় ইমরান নামের তিন বছরের শিশুর। ডুবে মারা গেছে কলমাকান্দার রংছাতি ইউনিয়নের নল্লাপাাড় গ্রামের তিন বছরের শিশু সোয়াইবা। লক্ষণীয়, কলমাকান্দায় এ-পাঁচ বছরের শিশু বেশি মারা গেছে।
হাসপাতাল ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে গণমাধ্যমের খবর, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় ৮১ শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। শুধু কলমাকান্দায় মারা গেছে ২০ জন। ২০২২ ও ২৩ সালে এ জেলায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু বেশি হয়েছে। তবে প্রতি বছর পানিতে ডুবে এমন মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও অভিযোগ রয়েছে, মৃত্যুরোধে প্রশাসনের উদ্যোগ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। স্থানীয়রা বলছেন, পরিবারের অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব এবং পুকুর-খাল বেশি হওয়ায় প্রতিনিয়ত এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। সরকারিভাবে দীর্ঘ দিন ধরে উদ্যোগ নেয়ার কথা শোনা গেলেও কোনো কিছু বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা।
সদ্য বদলি হওয়া জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন, ‘পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা রোধে জেলা প্রশাসন থেকে বেশ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। হাওর পাড়ে যেসব নৌকা চলাচল করে, সেগুলোয় পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করা হয়েছে। শিশুদের সাঁতার শেখার প্রশিক্ষণ একাডেমি করা যায় কি না, সে ব্যাপারেও গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি শিশু যত্নকেন্দ্র নামে প্রকল্প চলমান রয়ে রয়েছে তিন উপজেলায়।
নদীমেখলা বাংলাদেশে সবার সাঁতার জানা অপরিহার্য। শিশুরা সাঁতার জানে না এটা সত্য। অথচ নদীমাতৃক বাংলাদেশে সাঁতার শিখানোর ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেকে সাঁতার শিখতে পারছে না। পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু কমিয়ে আনতে নেত্রকোনা জেলায় জেলা প্রশাসন থেকে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করা দরকার। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে হবে।